সংবাদ শিরোনাম ::
শাওয়াল মাসের ছয় রোযার গুরুত্ব ও ফজিলত পবিত্র ঈদে অবাধ মেলামেশা: এক ভয়াবহ সামাজিক সংকট থার্টি ফার্স্ট নাইট : আত্মসমালোচনার বদলে আত্মবিস্মৃতি জুড়ী উপজেলা শাখায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নতুন কমিটি গঠিত ফ্যাশন-বিকৃতি, লিঙ্গ-পরিচয় ও মানসিক বিপর্যয় ইসলামের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবু বকর (রা): একটি নির্মোহ মূল্যায়ন ২২ বছর পর ভারতকে হারিয়ে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ৩ ধাপ এগোলো বাংলাদেশ মাদ্রাসায় নারী শিক্ষা বিস্তারের আহ্বান ধর্ম উপদেষ্টার দাওয়াতি কাজে মনোযোগ দিতে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত আজহারীর ময়লার ভাগাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে সাদ্দামের সাক্ষাৎকার, যোগ্য ব্যক্তি যোগ্য জায়গায়

মৃত্যু তাকে করেছে মহান: শিক্ষার্থীদের প্রাণ বাঁচাতে জীবন দিলেন শিক্ষিকা মাহেরিন চৌধুরী

নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১০:৪৭:৩২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫ ৮৭ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

মানুষ একবারই এ পৃথিবীতে আসে, আর মৃত্যুতেই জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। সেই প্রিয় জীবনও কখনো কখনো কেউ উৎসর্গ করেন অন্যের জন্য। তেমনি এক বিরল আত্মত্যাগের নজির স্থাপন করলেন শিক্ষিকা মাহেরিন চৌধুরী। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করলেন এই মমতাময়ী শিক্ষিকা।

সোমবার (২১ জুলাই) সকালে ঢাকার উত্তরা এলাকায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে আগুন ধরে যায়। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক ও বিভীষিকা। চারপাশে আগুন, কালো ধোঁয়ায় ঢাকা শ্রেণিকক্ষ, আর শিশুরা আতঙ্কে কান্নার রোল তুলেছে—ঠিক তখনই আগুনের মধ্যে ছুটে যান শিক্ষক মাহেরিন চৌধুরী। নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে তিনি টেনে বের করে আনেন একজন নয়, একে একে ২০ জন শিক্ষার্থীকে।

বিধ্বস্ত ভবনের করিডোরে ছড়িয়ে পড়া আগুন উপেক্ষা করে তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করেন একের পর এক। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ঘর থেকে সন্তানসম শিক্ষার্থীদের বের করে দিয়ে আবার ঢুকে পড়েন ভিতরে। এক শিক্ষার্থী জানায়, “আমরা বলছিলাম, ‘আম্মু, ভয় লাগতেছে।’ তিনি বলছিলেন, ‘আমি আছি, ভয় পেয়ো না।’ তিনি আমাদের ঠেলে বাইরে পাঠাচ্ছিলেন, নিজে বারবার ভিতরে যাচ্ছিলেন।”

শিক্ষকদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে আপন—শিক্ষার্থীদের ‘আম্মু’। তিনি ছিলেন কেবল একজন শিক্ষক নন, ছিলেন এক স্নেহময়ী অভিভাবক। সেই ভালোবাসা থেকেই নিজের প্রাণ বাজি রেখে ২০ শিক্ষার্থীর প্রাণ বাঁচান তিনি।

মাইলস্টোন স্কুলের এই শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছিলেন কো-অর্ডিনেটর হিসেবে। তার সতীর্থরা জানান, মাহেরিন চৌধুরী মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে মাস্টার্স করেন। উচ্চবংশীয় পরিবারে জন্ম হলেও ছিলেন বিনয়ী ও সাদামাটা। ছিলেন পর্দানশীল ও ইবাদতগুজার।

বিমান দুর্ঘটনায় তার শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশ পুড়ে যায়। লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থাতেও তিনি জ্ঞান হারাননি। চিকিৎসকদের বারবার বলছিলেন, “আমি ওদের বাঁচাতে পেরেছি তো?”

তার স্বামী জানান, “জীবনের শেষ মুহূর্তে সে আমার হাত ধরে বলেছিল, ‘তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না।’ আমি বলেছিলাম, তুমি সন্তানদের কথা একবারও ভাবলে না কেন? উত্তরে সে বলল, ‘ওরাও তো আমার সন্তান।’”

জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকদের অক্লান্ত চেষ্টার পরেও সোমবার (২১ জুলাই) রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

শিক্ষার্থীরা বলছে, “আমরা স্কুলে যাব, কিন্তু ম্যাডাম আর থাকবেন না। তার সাহস আমাদের পথ দেখাবে।”

অভিভাবকরাও কাঁদছেন, বলছেন, “আমার সন্তান হয়তো বেঁচে আছে এই মহান শিক্ষিকার কারণে।”

একজন শিক্ষক যে কেবল পাঠ্যপুস্তকের পাঠদাতা নন, বরং একজন পথপ্রদর্শক, অভিভাবক এবং আত্মত্যাগের প্রতীক—সেটিই প্রমাণ করে গেলেন মাহেরিন চৌধুরী। তার এই আত্মত্যাগ নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিদার।

আজ তিনি নেই, কিন্তু তার সাহস, ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ বাংলাদেশের শিক্ষা-ইতিহাসে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

Categories

মৃত্যু তাকে করেছে মহান: শিক্ষার্থীদের প্রাণ বাঁচাতে জীবন দিলেন শিক্ষিকা মাহেরিন চৌধুরী

আপডেট সময় : ১০:৪৭:৩২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫

 

মানুষ একবারই এ পৃথিবীতে আসে, আর মৃত্যুতেই জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। সেই প্রিয় জীবনও কখনো কখনো কেউ উৎসর্গ করেন অন্যের জন্য। তেমনি এক বিরল আত্মত্যাগের নজির স্থাপন করলেন শিক্ষিকা মাহেরিন চৌধুরী। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করলেন এই মমতাময়ী শিক্ষিকা।

সোমবার (২১ জুলাই) সকালে ঢাকার উত্তরা এলাকায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে আগুন ধরে যায়। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক ও বিভীষিকা। চারপাশে আগুন, কালো ধোঁয়ায় ঢাকা শ্রেণিকক্ষ, আর শিশুরা আতঙ্কে কান্নার রোল তুলেছে—ঠিক তখনই আগুনের মধ্যে ছুটে যান শিক্ষক মাহেরিন চৌধুরী। নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে তিনি টেনে বের করে আনেন একজন নয়, একে একে ২০ জন শিক্ষার্থীকে।

বিধ্বস্ত ভবনের করিডোরে ছড়িয়ে পড়া আগুন উপেক্ষা করে তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করেন একের পর এক। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ঘর থেকে সন্তানসম শিক্ষার্থীদের বের করে দিয়ে আবার ঢুকে পড়েন ভিতরে। এক শিক্ষার্থী জানায়, “আমরা বলছিলাম, ‘আম্মু, ভয় লাগতেছে।’ তিনি বলছিলেন, ‘আমি আছি, ভয় পেয়ো না।’ তিনি আমাদের ঠেলে বাইরে পাঠাচ্ছিলেন, নিজে বারবার ভিতরে যাচ্ছিলেন।”

শিক্ষকদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে আপন—শিক্ষার্থীদের ‘আম্মু’। তিনি ছিলেন কেবল একজন শিক্ষক নন, ছিলেন এক স্নেহময়ী অভিভাবক। সেই ভালোবাসা থেকেই নিজের প্রাণ বাজি রেখে ২০ শিক্ষার্থীর প্রাণ বাঁচান তিনি।

মাইলস্টোন স্কুলের এই শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছিলেন কো-অর্ডিনেটর হিসেবে। তার সতীর্থরা জানান, মাহেরিন চৌধুরী মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে মাস্টার্স করেন। উচ্চবংশীয় পরিবারে জন্ম হলেও ছিলেন বিনয়ী ও সাদামাটা। ছিলেন পর্দানশীল ও ইবাদতগুজার।

বিমান দুর্ঘটনায় তার শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশ পুড়ে যায়। লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থাতেও তিনি জ্ঞান হারাননি। চিকিৎসকদের বারবার বলছিলেন, “আমি ওদের বাঁচাতে পেরেছি তো?”

তার স্বামী জানান, “জীবনের শেষ মুহূর্তে সে আমার হাত ধরে বলেছিল, ‘তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না।’ আমি বলেছিলাম, তুমি সন্তানদের কথা একবারও ভাবলে না কেন? উত্তরে সে বলল, ‘ওরাও তো আমার সন্তান।’”

জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকদের অক্লান্ত চেষ্টার পরেও সোমবার (২১ জুলাই) রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

শিক্ষার্থীরা বলছে, “আমরা স্কুলে যাব, কিন্তু ম্যাডাম আর থাকবেন না। তার সাহস আমাদের পথ দেখাবে।”

অভিভাবকরাও কাঁদছেন, বলছেন, “আমার সন্তান হয়তো বেঁচে আছে এই মহান শিক্ষিকার কারণে।”

একজন শিক্ষক যে কেবল পাঠ্যপুস্তকের পাঠদাতা নন, বরং একজন পথপ্রদর্শক, অভিভাবক এবং আত্মত্যাগের প্রতীক—সেটিই প্রমাণ করে গেলেন মাহেরিন চৌধুরী। তার এই আত্মত্যাগ নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিদার।

আজ তিনি নেই, কিন্তু তার সাহস, ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ বাংলাদেশের শিক্ষা-ইতিহাসে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।