সংবাদ শিরোনাম ::
শাওয়াল মাসের ছয় রোযার গুরুত্ব ও ফজিলত পবিত্র ঈদে অবাধ মেলামেশা: এক ভয়াবহ সামাজিক সংকট থার্টি ফার্স্ট নাইট : আত্মসমালোচনার বদলে আত্মবিস্মৃতি জুড়ী উপজেলা শাখায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নতুন কমিটি গঠিত ফ্যাশন-বিকৃতি, লিঙ্গ-পরিচয় ও মানসিক বিপর্যয় ইসলামের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবু বকর (রা): একটি নির্মোহ মূল্যায়ন ২২ বছর পর ভারতকে হারিয়ে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ৩ ধাপ এগোলো বাংলাদেশ মাদ্রাসায় নারী শিক্ষা বিস্তারের আহ্বান ধর্ম উপদেষ্টার দাওয়াতি কাজে মনোযোগ দিতে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত আজহারীর ময়লার ভাগাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে সাদ্দামের সাক্ষাৎকার, যোগ্য ব্যক্তি যোগ্য জায়গায়

ইসলামের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবু বকর (রা): একটি নির্মোহ মূল্যায়ন

মোহাম্মদ আশিকুর রহমান
  • আপডেট সময় : ১০:০৯:১৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫ ১৪৪ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

ইসলামের ইতিহাসে হযরত আবু বকর (রা) এমন এক ব্যক্তিত্ব যাঁর জীবন, চরিত্র ও নেতৃত্ব মুসলিম উম্মাহর জন্য চিরন্তন দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। নবীজির (সা.) জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর উভয় সময়েই ইসলামের রক্ষা, সংরক্ষণ ও প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ভালোবাসতেন, বিশ্বাস করতেন এবং তাঁকে তাঁর জীবনের সর্বাধিক ঘনিষ্ঠ সহচর বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। নবীজির ইন্তেকালের পর ইসলামের যে অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, আবু বকর (রা) তাঁর প্রজ্ঞা, সাহস ও ত্যাগের মাধ্যমে মুসলমানদের একত্রিত করে ইসলামের পতাকাকে পুনরায় শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

তাঁর শাসনকাল মাত্র দুই বছর তিন মাস হলেও ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন, বিদ্রোহ দমন, কুরআন সংরক্ষণ ও ইসলামী প্রশাসনের কাঠামো নির্মাণে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়।

আবু বকর (রা)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

হযরত আবু বকর (রা)-এর প্রকৃত নাম ছিল আবদুল্লাহ ইবনু আবু কুহাফা উসমান ইবনে আমির। তাঁর উপাধি ছিল আস-সিদ্দিক, যার অর্থ “সত্যনিষ্ঠ”। তিনি ৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। কুরাইশ বংশের বনী তায়েম গোত্রের তিনি এক সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন।

ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি ব্যবসায়ী হিসেবে অত্যন্ত সৎ ও বিশ্বস্ত খ্যাতি অর্জন করেন। যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) নবুওয়াত প্রাপ্ত হন, তখন আবু বকর (রা) ছিলেন প্রথম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ যিনি কোনো দ্বিধা ছাড়াই ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর গ্রহণ করা ইসলাম পরবর্তী কালে ইসলামের ইতিহাসে একটি মোড় ঘুরিয়ে দেয়, কারণ তাঁর দাওয়াতের মাধ্যমে উসমান (রা), আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা), তালহা (রা), যুবাইর (রা) প্রমুখ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ইসলাম গ্রহণ করেন।

নবীজির জীবনে আবু বকর (রা)-এর অবদান

১. সহচর ও সমর্থক

আবু বকর (রা) নবীজির দাওয়াতের প্রথম দিন থেকেই পাশে ছিলেন। ইসলামের শুরুর কঠিন সময়ে তিনি নবীজির জন্য নিজের সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেন।

২. হিজরতের সঙ্গী

হিজরতের সময় নবীজির একমাত্র সঙ্গী ছিলেন আবু বকর (রা)। কুরআনে এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন— “যখন তারা দুজন গুহায় ছিল এবং সে (নবী) তার সঙ্গীকে বলেছিল, ভয় করো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” (সূরা আত-তাওবা: ৪০)

৩. ত্যাগ ও দানশীলতা

বদর, উহুদ, তাবুকসহ প্রতিটি যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। তাবুক অভিযানের সময় তিনি নিজের সব সম্পদ দান করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন— “হে আল্লাহর রাসুল! আমি পরিবারের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে রেখে এসেছি।”

খিলাফত প্রাপ্তি ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ সময়

৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে নবীজির ইন্তেকালের পর মুসলমানদের মধ্যে নেতৃত্বের প্রশ্নে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। সেই সময় আবু বকর (রা)-এর দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞা মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করে। উমর (রা)-এর পরামর্শে তিনি খলিফা হিসেবে নির্বাচিত হন। তাঁর খিলাফতের প্রথম কাজ ছিল মুরতাদ বিদ্রোহ দমন, যাকাত প্রত্যাখ্যানকারী গোত্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, এবং ইসলামী রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন।

ইসলামের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবু বকর (রা)-এর অবদান

১. ইসলামী ঐক্য রক্ষা ও বিদ্রোহ দমন

নবীজির মৃত্যুর পর আরবের বহু গোত্র ইসলাম ত্যাগ করে বা যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানায়। আবু বকর (রা) দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন— “যদি তারা একটি দড়িও যাকাত হিসেবে না দেয়, যা তারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে দিত, আমি তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব।” এই দৃঢ় নীতির ফলে ইসলামের ভিত্তি পুনরায় শক্তিশালী হয়।

২. কুরআন সংরক্ষণ উদ্যোগ

ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হাফেজে কুরআন শহিদ হলে, উমর (রা)-এর পরামর্শে তিনি কুরআনকে একত্র করার নির্দেশ দেন। জাইদ ইবনে সাবিত (রা)-এর নেতৃত্বে কুরআনের সংরক্ষণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। এটি ইসলামী সভ্যতার অন্যতম বড় অবদান।

৩. রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়নীতি ও সরলতা

খলিফা হওয়ার পর তিনি নিজ বেতনও জনগণের অনুমোদনে গ্রহণ করতেন। প্রশাসনের যেকোনো সিদ্ধান্তে তিনি পরামর্শ ও শূরা পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। তাঁর বক্তব্য ছিল— “যদি আমি সঠিক পথে থাকি, তবে আমাকে অনুসরণ করো। আর যদি আমি ভুল করি, তবে আমাকে সোজা করে দাও।”

৪. দাওয়াত ও ইসলামের প্রসার

তিনি মুসলিম বাহিনী প্রেরণ করেন সিরিয়া, ইরাক ও পারস্য অঞ্চলে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দিতে। তাঁর শাসনামলেই ইসলামী রাষ্ট্রের সীমা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়।

৫. প্রশাসনিক নীতি ও নেতৃত্ব

আবু বকর (রা) প্রশাসনের কাঠামো গঠন করেন তিন স্তরে—

১. কেন্দ্রীয় সরকার (মদিনা)

২. প্রাদেশিক প্রশাসন (ওয়ালি বা গভর্নর)

৩. সেনাপতি ও আমলারা

তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিতেন যেন তারা জনগণের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন এবং সম্পদে কখনো লোভ না করেন।

 

আবু বকর (রা)-এর চরিত্র ও নেতৃত্বগুণ

বৈশিষ্ট্য                                   বিবরণ

সত্যনিষ্ঠতা                       সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে                                   অবস্থান করেছেন।

তাকওয়া ও খোদাভীতি       আল্লাহর ভয় ছিল তাঁর                       হৃদয়ে সর্বদা বিদ্যমান।

নম্রতা ও দয়া                দরিদ্র, দাস ও অসহায়দের                                       সাহায্যে সর্বদা এগিয়ে আসতেন।

দৃঢ় নেতৃত্ব                 কঠিন সময়েও সাহসিকতার সঙ্গে                                    সিদ্ধান্ত নিতেন।

সর্বজনীন ভালোবাসা       মুসলমানদের মাঝে বিভক্তি না হয়ে                         ঐক্যবদ্ধতা সৃষ্টি করেছিলেন।

নির্মোহ মূল্যায়ন

হযরত আবু বকর (রা) ইসলামের প্রথম খলিফা হিসেবে মুসলমানদের এক ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্বে রূপান্তরিত করেন। নবীজির রেখে যাওয়া দায়িত্ব তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। যদিও তাঁর শাসনকাল ছিল স্বল্প, তবুও সেই অল্প সময়ে তিনি ইসলামী রাষ্ট্রের এমন ভিত্তি স্থাপন করেন যার ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তী খলিফাগণ বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।

তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে ইসলামের “ত্রাণকর্তা”, যিনি মুসলিম উম্মাহকে অরাজকতা থেকে রক্ষা করেন, ইসলামী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করেন এবং কুরআনের সংরক্ষণ নিশ্চিত করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ইসলামী ইতিহাস এক নতুন যুগে প্রবেশ করে।

উপসংহার

হযরত আবু বকর (রা)-এর জীবন ইসলামের জন্য এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত। তিনি একজন আদর্শ নেতা, ন্যায়নিষ্ঠ শাসক ও মহান মানবিক ব্যক্তিত্ব। নবীজির ইন্তেকালের পর তিনি যে স্থিরতা ও সাহস দেখিয়েছিলেন, তা ইসলামী ইতিহাসে অনন্য। মুসলমানদের উচিত তাঁর জীবন থেকে নেতৃত্ব, ত্যাগ ও ঈমানের শিক্ষা গ্রহণ করা।

আবু বকর (রা) কেবল ইসলামের প্রথম খলিফা নন—তিনি ইসলামের রক্ষাকর্তা, ত্রাণকর্তা এবং মুসলিম ঐক্যের অগ্রদূত।

 

তথ্যসূত্র: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, তারিখে তাবারি, রাহিকুল মাখতুম

● মোহাম্মদ আশিকুর রহমান: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

Categories

ইসলামের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবু বকর (রা): একটি নির্মোহ মূল্যায়ন

আপডেট সময় : ১০:০৯:১৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫

 

ইসলামের ইতিহাসে হযরত আবু বকর (রা) এমন এক ব্যক্তিত্ব যাঁর জীবন, চরিত্র ও নেতৃত্ব মুসলিম উম্মাহর জন্য চিরন্তন দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। নবীজির (সা.) জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর উভয় সময়েই ইসলামের রক্ষা, সংরক্ষণ ও প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ভালোবাসতেন, বিশ্বাস করতেন এবং তাঁকে তাঁর জীবনের সর্বাধিক ঘনিষ্ঠ সহচর বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। নবীজির ইন্তেকালের পর ইসলামের যে অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, আবু বকর (রা) তাঁর প্রজ্ঞা, সাহস ও ত্যাগের মাধ্যমে মুসলমানদের একত্রিত করে ইসলামের পতাকাকে পুনরায় শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

তাঁর শাসনকাল মাত্র দুই বছর তিন মাস হলেও ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন, বিদ্রোহ দমন, কুরআন সংরক্ষণ ও ইসলামী প্রশাসনের কাঠামো নির্মাণে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়।

আবু বকর (রা)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

হযরত আবু বকর (রা)-এর প্রকৃত নাম ছিল আবদুল্লাহ ইবনু আবু কুহাফা উসমান ইবনে আমির। তাঁর উপাধি ছিল আস-সিদ্দিক, যার অর্থ “সত্যনিষ্ঠ”। তিনি ৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। কুরাইশ বংশের বনী তায়েম গোত্রের তিনি এক সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন।

ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি ব্যবসায়ী হিসেবে অত্যন্ত সৎ ও বিশ্বস্ত খ্যাতি অর্জন করেন। যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) নবুওয়াত প্রাপ্ত হন, তখন আবু বকর (রা) ছিলেন প্রথম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ যিনি কোনো দ্বিধা ছাড়াই ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর গ্রহণ করা ইসলাম পরবর্তী কালে ইসলামের ইতিহাসে একটি মোড় ঘুরিয়ে দেয়, কারণ তাঁর দাওয়াতের মাধ্যমে উসমান (রা), আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা), তালহা (রা), যুবাইর (রা) প্রমুখ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ইসলাম গ্রহণ করেন।

নবীজির জীবনে আবু বকর (রা)-এর অবদান

১. সহচর ও সমর্থক

আবু বকর (রা) নবীজির দাওয়াতের প্রথম দিন থেকেই পাশে ছিলেন। ইসলামের শুরুর কঠিন সময়ে তিনি নবীজির জন্য নিজের সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেন।

২. হিজরতের সঙ্গী

হিজরতের সময় নবীজির একমাত্র সঙ্গী ছিলেন আবু বকর (রা)। কুরআনে এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন— “যখন তারা দুজন গুহায় ছিল এবং সে (নবী) তার সঙ্গীকে বলেছিল, ভয় করো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” (সূরা আত-তাওবা: ৪০)

৩. ত্যাগ ও দানশীলতা

বদর, উহুদ, তাবুকসহ প্রতিটি যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। তাবুক অভিযানের সময় তিনি নিজের সব সম্পদ দান করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন— “হে আল্লাহর রাসুল! আমি পরিবারের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে রেখে এসেছি।”

খিলাফত প্রাপ্তি ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ সময়

৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে নবীজির ইন্তেকালের পর মুসলমানদের মধ্যে নেতৃত্বের প্রশ্নে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। সেই সময় আবু বকর (রা)-এর দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞা মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করে। উমর (রা)-এর পরামর্শে তিনি খলিফা হিসেবে নির্বাচিত হন। তাঁর খিলাফতের প্রথম কাজ ছিল মুরতাদ বিদ্রোহ দমন, যাকাত প্রত্যাখ্যানকারী গোত্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, এবং ইসলামী রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন।

ইসলামের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবু বকর (রা)-এর অবদান

১. ইসলামী ঐক্য রক্ষা ও বিদ্রোহ দমন

নবীজির মৃত্যুর পর আরবের বহু গোত্র ইসলাম ত্যাগ করে বা যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানায়। আবু বকর (রা) দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন— “যদি তারা একটি দড়িও যাকাত হিসেবে না দেয়, যা তারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে দিত, আমি তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব।” এই দৃঢ় নীতির ফলে ইসলামের ভিত্তি পুনরায় শক্তিশালী হয়।

২. কুরআন সংরক্ষণ উদ্যোগ

ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হাফেজে কুরআন শহিদ হলে, উমর (রা)-এর পরামর্শে তিনি কুরআনকে একত্র করার নির্দেশ দেন। জাইদ ইবনে সাবিত (রা)-এর নেতৃত্বে কুরআনের সংরক্ষণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। এটি ইসলামী সভ্যতার অন্যতম বড় অবদান।

৩. রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়নীতি ও সরলতা

খলিফা হওয়ার পর তিনি নিজ বেতনও জনগণের অনুমোদনে গ্রহণ করতেন। প্রশাসনের যেকোনো সিদ্ধান্তে তিনি পরামর্শ ও শূরা পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। তাঁর বক্তব্য ছিল— “যদি আমি সঠিক পথে থাকি, তবে আমাকে অনুসরণ করো। আর যদি আমি ভুল করি, তবে আমাকে সোজা করে দাও।”

৪. দাওয়াত ও ইসলামের প্রসার

তিনি মুসলিম বাহিনী প্রেরণ করেন সিরিয়া, ইরাক ও পারস্য অঞ্চলে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দিতে। তাঁর শাসনামলেই ইসলামী রাষ্ট্রের সীমা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়।

৫. প্রশাসনিক নীতি ও নেতৃত্ব

আবু বকর (রা) প্রশাসনের কাঠামো গঠন করেন তিন স্তরে—

১. কেন্দ্রীয় সরকার (মদিনা)

২. প্রাদেশিক প্রশাসন (ওয়ালি বা গভর্নর)

৩. সেনাপতি ও আমলারা

তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিতেন যেন তারা জনগণের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন এবং সম্পদে কখনো লোভ না করেন।

 

আবু বকর (রা)-এর চরিত্র ও নেতৃত্বগুণ

বৈশিষ্ট্য                                   বিবরণ

সত্যনিষ্ঠতা                       সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে                                   অবস্থান করেছেন।

তাকওয়া ও খোদাভীতি       আল্লাহর ভয় ছিল তাঁর                       হৃদয়ে সর্বদা বিদ্যমান।

নম্রতা ও দয়া                দরিদ্র, দাস ও অসহায়দের                                       সাহায্যে সর্বদা এগিয়ে আসতেন।

দৃঢ় নেতৃত্ব                 কঠিন সময়েও সাহসিকতার সঙ্গে                                    সিদ্ধান্ত নিতেন।

সর্বজনীন ভালোবাসা       মুসলমানদের মাঝে বিভক্তি না হয়ে                         ঐক্যবদ্ধতা সৃষ্টি করেছিলেন।

নির্মোহ মূল্যায়ন

হযরত আবু বকর (রা) ইসলামের প্রথম খলিফা হিসেবে মুসলমানদের এক ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্বে রূপান্তরিত করেন। নবীজির রেখে যাওয়া দায়িত্ব তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। যদিও তাঁর শাসনকাল ছিল স্বল্প, তবুও সেই অল্প সময়ে তিনি ইসলামী রাষ্ট্রের এমন ভিত্তি স্থাপন করেন যার ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তী খলিফাগণ বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।

তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে ইসলামের “ত্রাণকর্তা”, যিনি মুসলিম উম্মাহকে অরাজকতা থেকে রক্ষা করেন, ইসলামী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করেন এবং কুরআনের সংরক্ষণ নিশ্চিত করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ইসলামী ইতিহাস এক নতুন যুগে প্রবেশ করে।

উপসংহার

হযরত আবু বকর (রা)-এর জীবন ইসলামের জন্য এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত। তিনি একজন আদর্শ নেতা, ন্যায়নিষ্ঠ শাসক ও মহান মানবিক ব্যক্তিত্ব। নবীজির ইন্তেকালের পর তিনি যে স্থিরতা ও সাহস দেখিয়েছিলেন, তা ইসলামী ইতিহাসে অনন্য। মুসলমানদের উচিত তাঁর জীবন থেকে নেতৃত্ব, ত্যাগ ও ঈমানের শিক্ষা গ্রহণ করা।

আবু বকর (রা) কেবল ইসলামের প্রথম খলিফা নন—তিনি ইসলামের রক্ষাকর্তা, ত্রাণকর্তা এবং মুসলিম ঐক্যের অগ্রদূত।

 

তথ্যসূত্র: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, তারিখে তাবারি, রাহিকুল মাখতুম

● মোহাম্মদ আশিকুর রহমান: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।