সংবাদ শিরোনাম ::
শাওয়াল মাসের ছয় রোযার গুরুত্ব ও ফজিলত পবিত্র ঈদে অবাধ মেলামেশা: এক ভয়াবহ সামাজিক সংকট থার্টি ফার্স্ট নাইট : আত্মসমালোচনার বদলে আত্মবিস্মৃতি জুড়ী উপজেলা শাখায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নতুন কমিটি গঠিত ফ্যাশন-বিকৃতি, লিঙ্গ-পরিচয় ও মানসিক বিপর্যয় ইসলামের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবু বকর (রা): একটি নির্মোহ মূল্যায়ন ২২ বছর পর ভারতকে হারিয়ে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ৩ ধাপ এগোলো বাংলাদেশ মাদ্রাসায় নারী শিক্ষা বিস্তারের আহ্বান ধর্ম উপদেষ্টার দাওয়াতি কাজে মনোযোগ দিতে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত আজহারীর ময়লার ভাগাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে সাদ্দামের সাক্ষাৎকার, যোগ্য ব্যক্তি যোগ্য জায়গায়

রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে বাড়ছে চোরাচালান, দেশ ও সমাজ বিধ্বংসী এই কাজের শেষ কোথায়?

আতিকুর রহমান রাসেল, কচ্ছপিয়া (রামু) প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০১:২০:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ অগাস্ট ২০২৫ ৩০১ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

কক্সবাজারের রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়ন এবং পার্শ্ববর্তী বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন রাতের আঁধারে চোরাই পথে বাংলাদেশে ঢুকছে শত শত গরু। পতিত স্বৈরাচারের শাসনামলে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়া সীমান্ত দিয়ে চলা এই চোরাচালান ব্যবসা থামছে না বললেই চলে।

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে চোরাচালান ব্যবসার সাথে জড়িত কতিপয় অসাধু ব্যক্তি প্রশাসনের হাতে ধরা পড়ার পর কিছুটা শীতলতা আসলেও অবৈধ সিন্ডিকেট এই কার্যক্রমকে জিইয়ে রেখেছে। যার ফলে সময়ের সাথে সাথে তা আবারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পথে গরু-মহিষ যেমন ঢুকছে, তেমনি সিগারেট, স্বর্ণের বার এবং দেশ ও সমাজ বিধ্বংসী ইয়াবা-হিরোইনসহ নানা রকম মাদকদ্রব্য এই পথে ঢুকছে। এছাড়া দৈনিক এই অবৈধ পথ দিয়েই দেশীয় শত শত পণ্যদ্রব্য বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে একদিকে যেমন সরকার দৈনিক শত কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি দেশীয় কোটি কোটি টাকা ও সম্পদ বাইরে চলে যাচ্ছে।

এই অবৈধ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছরে এই জনপদের অনেকগুলো মানুষ খুনের শিকার হয়েছে এবং সীমান্তে পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে অনেক মানুষের প্রাণহানি ও অঙ্গহানির মতো ঘটনা ঘটেছে। শুধু তাই নয়, এই চোরাকারবারির ফলে যুবসমাজ পড়ালেখা থেকে দিনদিন দূরে যাচ্ছে, যা গত কয়েক বছরে এই এলাকার শিক্ষার হারের দিকে লক্ষ করলে স্পষ্ট হয়ে যায়।

তাছাড়া পাহাড়ি দুর্গম পথ এবং নদীপথ ব্যবহার করে গরুগুলো প্রবেশ করছে অভ্যন্তরীণ বাজারে, যা এখন দেশীয় খামারিদের জন্য এক বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়রা জানান, সন্ধ্যার পর থেকেই সীমান্ত এলাকায় বাড়ে চোরাচালানকারীদের তৎপরতা। মিয়ানমার ও ভারত থেকে আসা গরুগুলোকে ‘বার্মাই গরু’ নামে ডাকা হয়। এসব গরু মূলত চাকঢালা, ঘুমধুম, লম্বাশিয়া, ফুলতলী ও লেমুছড়ি সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। বিভিন্ন পাহাড়ি পথ দিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর নজর এড়িয়ে এসব গরু বাজারে চলে যায়।

গরু প্রতি নির্ধারিত ‘চাঁদা’ দিয়ে সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় গরুগুলো নিরাপদে পার হয়ে আসে। এই সিন্ডিকেটে জড়িত স্থানীয় দালাল, প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং কখনো কখনো প্রশাসনের একাংশও। ফলে চোরাচালান ঠেকাতে প্রশাসনিক পদক্ষেপ প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

দেশীয় গরুর খামারিরা বলছেন, তারা বছরে পরিশ্রম করে ১টি বা ২টি গরু লালন-পালন করেন দেশীয় বাজারে বিক্রি করে লাভবান হওয়ার আশায়। কিন্তু চোরাই গরু বাজারে ঢুকে দাম পড়ে যায়, দেশি গরু বিক্রি হয় না বা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে তারা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

একজন খামারি বলেন, “চোরাই গরু আসার পর আমরা যেন বাজারে অদৃশ্য হয়ে যাই। কষ্ট করে বড় করা গরুর দাম উঠছে না, আর লোকসান গুনতে হচ্ছে।”

পাশাপাশি, এসব গরু কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই ঢুকছে, যা জনস্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের প্রাণের দাবি হলো—সীমান্তে কড়া নজরদারি, প্রযুক্তি ব্যবহার, চেকপোস্টে স্ক্যানিং ব্যবস্থা ও জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ। তাদের মতে, প্রশাসনের কঠিন পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে এই অবৈধ চোরাচালান ব্যবসা যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না হয় এবং এভাবে চলতে থাকে, তাহলে এই দেশ ও সমাজ ধ্বংসের অতল গহ্বরে চলে যাবে।

রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান ব্যবসা এখন আর শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে দেশ, সমাজ ও অর্থনীতির এক হুমকি। জাতীয় স্বার্থে যুব ও ছাত্রসমাজকে শিক্ষার দিকে ধাবিত করতে সচেতন মহল এবং প্রশাসনের সমন্বয়ে এই চোরাচালান বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কঠিন থেকে কঠিন অপরাধে জড়িয়ে পড়বে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটার সম্ভাবনাও রয়েছে।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

Categories

রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে বাড়ছে চোরাচালান, দেশ ও সমাজ বিধ্বংসী এই কাজের শেষ কোথায়?

আপডেট সময় : ০১:২০:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ অগাস্ট ২০২৫

 

কক্সবাজারের রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়ন এবং পার্শ্ববর্তী বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন রাতের আঁধারে চোরাই পথে বাংলাদেশে ঢুকছে শত শত গরু। পতিত স্বৈরাচারের শাসনামলে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়া সীমান্ত দিয়ে চলা এই চোরাচালান ব্যবসা থামছে না বললেই চলে।

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে চোরাচালান ব্যবসার সাথে জড়িত কতিপয় অসাধু ব্যক্তি প্রশাসনের হাতে ধরা পড়ার পর কিছুটা শীতলতা আসলেও অবৈধ সিন্ডিকেট এই কার্যক্রমকে জিইয়ে রেখেছে। যার ফলে সময়ের সাথে সাথে তা আবারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পথে গরু-মহিষ যেমন ঢুকছে, তেমনি সিগারেট, স্বর্ণের বার এবং দেশ ও সমাজ বিধ্বংসী ইয়াবা-হিরোইনসহ নানা রকম মাদকদ্রব্য এই পথে ঢুকছে। এছাড়া দৈনিক এই অবৈধ পথ দিয়েই দেশীয় শত শত পণ্যদ্রব্য বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে একদিকে যেমন সরকার দৈনিক শত কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি দেশীয় কোটি কোটি টাকা ও সম্পদ বাইরে চলে যাচ্ছে।

এই অবৈধ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছরে এই জনপদের অনেকগুলো মানুষ খুনের শিকার হয়েছে এবং সীমান্তে পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে অনেক মানুষের প্রাণহানি ও অঙ্গহানির মতো ঘটনা ঘটেছে। শুধু তাই নয়, এই চোরাকারবারির ফলে যুবসমাজ পড়ালেখা থেকে দিনদিন দূরে যাচ্ছে, যা গত কয়েক বছরে এই এলাকার শিক্ষার হারের দিকে লক্ষ করলে স্পষ্ট হয়ে যায়।

তাছাড়া পাহাড়ি দুর্গম পথ এবং নদীপথ ব্যবহার করে গরুগুলো প্রবেশ করছে অভ্যন্তরীণ বাজারে, যা এখন দেশীয় খামারিদের জন্য এক বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়রা জানান, সন্ধ্যার পর থেকেই সীমান্ত এলাকায় বাড়ে চোরাচালানকারীদের তৎপরতা। মিয়ানমার ও ভারত থেকে আসা গরুগুলোকে ‘বার্মাই গরু’ নামে ডাকা হয়। এসব গরু মূলত চাকঢালা, ঘুমধুম, লম্বাশিয়া, ফুলতলী ও লেমুছড়ি সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। বিভিন্ন পাহাড়ি পথ দিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর নজর এড়িয়ে এসব গরু বাজারে চলে যায়।

গরু প্রতি নির্ধারিত ‘চাঁদা’ দিয়ে সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় গরুগুলো নিরাপদে পার হয়ে আসে। এই সিন্ডিকেটে জড়িত স্থানীয় দালাল, প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং কখনো কখনো প্রশাসনের একাংশও। ফলে চোরাচালান ঠেকাতে প্রশাসনিক পদক্ষেপ প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

দেশীয় গরুর খামারিরা বলছেন, তারা বছরে পরিশ্রম করে ১টি বা ২টি গরু লালন-পালন করেন দেশীয় বাজারে বিক্রি করে লাভবান হওয়ার আশায়। কিন্তু চোরাই গরু বাজারে ঢুকে দাম পড়ে যায়, দেশি গরু বিক্রি হয় না বা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে তারা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

একজন খামারি বলেন, “চোরাই গরু আসার পর আমরা যেন বাজারে অদৃশ্য হয়ে যাই। কষ্ট করে বড় করা গরুর দাম উঠছে না, আর লোকসান গুনতে হচ্ছে।”

পাশাপাশি, এসব গরু কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই ঢুকছে, যা জনস্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের প্রাণের দাবি হলো—সীমান্তে কড়া নজরদারি, প্রযুক্তি ব্যবহার, চেকপোস্টে স্ক্যানিং ব্যবস্থা ও জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ। তাদের মতে, প্রশাসনের কঠিন পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে এই অবৈধ চোরাচালান ব্যবসা যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না হয় এবং এভাবে চলতে থাকে, তাহলে এই দেশ ও সমাজ ধ্বংসের অতল গহ্বরে চলে যাবে।

রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান ব্যবসা এখন আর শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে দেশ, সমাজ ও অর্থনীতির এক হুমকি। জাতীয় স্বার্থে যুব ও ছাত্রসমাজকে শিক্ষার দিকে ধাবিত করতে সচেতন মহল এবং প্রশাসনের সমন্বয়ে এই চোরাচালান বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কঠিন থেকে কঠিন অপরাধে জড়িয়ে পড়বে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটার সম্ভাবনাও রয়েছে।