সংবাদ শিরোনাম ::
শাওয়াল মাসের ছয় রোযার গুরুত্ব ও ফজিলত পবিত্র ঈদে অবাধ মেলামেশা: এক ভয়াবহ সামাজিক সংকট থার্টি ফার্স্ট নাইট : আত্মসমালোচনার বদলে আত্মবিস্মৃতি জুড়ী উপজেলা শাখায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নতুন কমিটি গঠিত ফ্যাশন-বিকৃতি, লিঙ্গ-পরিচয় ও মানসিক বিপর্যয় ইসলামের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবু বকর (রা): একটি নির্মোহ মূল্যায়ন ২২ বছর পর ভারতকে হারিয়ে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ৩ ধাপ এগোলো বাংলাদেশ মাদ্রাসায় নারী শিক্ষা বিস্তারের আহ্বান ধর্ম উপদেষ্টার দাওয়াতি কাজে মনোযোগ দিতে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত আজহারীর ময়লার ভাগাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে সাদ্দামের সাক্ষাৎকার, যোগ্য ব্যক্তি যোগ্য জায়গায়

চাপের মুখে ঘর ছাড়ছেন গুরুগ্রামের মুসলিম শ্রমিকরা, আতঙ্কে ঘরবন্দি অনেকেই

নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০১:০২:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই ২০২৫ ১৫১ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

গুরুগ্রাম থেকে বাংলাদেশি সন্দেহে আটক হওয়ার ভয়ে ফিরে যাচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের বহু মুসলিম শ্রমিক। কেউ কেউ সাতদিন আটক থাকার পর ছাড়া পেলেও এখনও ঘর থেকে বেরোতে ভয় পাচ্ছেন, আবার কেউ ট্রেনের টিকিটের অপেক্ষায়, যেদিন পাবেন সেদিনই রওনা হবেন বলে জানাচ্ছেন।

অনেকে ট্রেনের টিকিটের জন্য অপেক্ষা না করে নিজেরাই বাস ভাড়া করে পাড়ি জমিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের দিকে। জনপ্রতি প্রায় আড়াই হাজার টাকা করে খরচ পড়ছে। তবে একাংশের দুশ্চিন্তা—দেশে ফিরে গেলে বয়স্ক বাবা-মা আর ছোট সন্তানদের কী খাওয়াবেন?

এইসব মানুষ মূলত কর্মসূত্রে দিল্লি সংলগ্ন গুরুগ্রামে থাকেন। তাদের মধ্যে অনেকেই সম্প্রতি পুলিশি অভিযানে আটক হয়েছিলেন ‌‌‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে।

স্থানীয় শ্রমিক সংগঠক মুকুল শেখ বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের বহু মানুষ এখান থেকে ফিরে গেছেন। যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে পুলিশ আবার যদি ধরে নিয়ে যায়, এই আশঙ্কায় সবাই আতঙ্কে রয়েছে।”

গত কয়েক মাসে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবৈধ ‘বাংলাদেশি’ শনাক্ত করতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষীদেরও আটক করা হচ্ছে। এদের পরিচয় যাচাই করতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কাছে পাঠানো হচ্ছে তথ্য। এমন ঘটনাও সামনে এসেছে যেখানে প্রকৃত ভারতীয় হয়েও কাউকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ভয়ে ঘরছাড়া হচ্ছেন না অনেকে

মালদা জেলার চাঁচোলের বাসিন্দা আনিসুর রহমান স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে গুরুগ্রামে থাকেন প্রায় আট বছর। তিনি গাড়ি ধোয়ার কাজ করেন, স্ত্রী গৃহকর্মী, ছেলে ছোটখাটো কাজে যুক্ত। কয়েক সপ্তাহ আগে তাকেও ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক করে পুলিশ।

“চাঁচোল থানা থেকে আমার পরিচয় যাচাই করে আনার পরে আমাকে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু সাতদিন ধরে কমিউনিটি সেন্টারে আটকে রেখেছিল। আধার কার্ডসহ সব পরিচয় দেখিয়েছিলাম, কিন্তু কিছুই শোনেনি। এখন কোনো কাগজও দেয়নি—যে আমার পরিচয় যাচাই হয়ে গেছে। এই অবস্থায় আবার যদি ধরে নিয়ে যায়, সেই ভয়ে আমি সাতদিন ধরে ঘর থেকেই বের হইনি,” বলেন আনিসুর।

তিনি আরও বলেন, “২ আগস্টের ট্রেনের টিকিট কেটে রেখেছি। যেদিন টিকিট সেইদিনই চলে যাব। মাসে ৭০ হাজার টাকা রোজগার করতাম আমরা তিনজন মিলে। কিছু ধারও আছে। এখন বাড়ি ফিরে কীভাবে সংসার চালাব জানি না। তবে এখানে আর থাকা যাবে না।”

তার সঙ্গেই আটক হওয়া আরও চারজন ইতিমধ্যেই ফিরে গেছেন বলে জানান তিনি।

“এখানে এসেই ফেঁসে গেলাম”

আরেক শ্রমিক, মালদার বাসিন্দা মুকুল হোসেন বছরখানেক আগে গুরুগ্রামে এসেছিলেন রাজমিস্ত্রির কাজ করতে। তাকেও আনিসুরের সঙ্গেই পুলিশ ধরেছিল।

তিনি বলেন, “আমার সব কাগজপত্র ছিল, তাও আটকে রেখেছিল। এখন আর সাহস হচ্ছে না এখানে থাকতে। দিল্লি থেকে ট্রেনে চড়ে ফিরে যাচ্ছি।”

ট্রেনের টিকিট না পেয়ে অনেকেই বাস ভাড়া করে পশ্চিমবঙ্গে ফিরছেন। রোজই গুরুগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে একাধিক বাস ছাড়ছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুপান্থ সিনহা জানান, তিনি দু’বার গুরুগ্রামের বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় গেছেন। “অনেক ঘর ফাঁকা দেখেছি। মানুষজন ভয়ে কথা বলতে পারছেন না। খুব আতঙ্কের পরিবেশ।”

শ্রমিক সংগঠক মুকুল শেখ জানান, যারা ফিরে গেছেন তাদের বেশিরভাগই মুসলমান, হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা অনেকেই এখনও রয়েছেন।

দেশে ফিরে কী খাব?

ফুড ডেলিভারি অ্যাপে কাজ করতেন নূর আলম। গুরুগ্রাম পুলিশ তাকে ছয়দিন আটকে রেখেছিল বাংলাদেশি সন্দেহে। পরিচয় যাচাইয়ের পর ছাড়া পেয়েছেন।

তিনি বলেন, “এখানে যা পরিস্থিতি, দেশে ফিরতেই হবে। কিন্তু ফিরে গিয়ে সংসার চালাব কীভাবে? দেশে মা-বাবা আর ছোট সন্তান আছে। ওদের মুখে খাবার দেব কীভাবে?”

নূর আলম জানান, তার আরও ১০টি পরিচিত পরিবার এখনো টিকিটের জন্য অপেক্ষায়। তিনি নিজে ফিরে গিয়ে হয়তো ব্যবসা শুরু করতে পারেন বলেও ভাবছেন।

পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক আসিফ ফারুক বলেন, “যারা অন্য রাজ্যে আটক হয়েছিলেন, তাদের অনেকেই এখন ফিরে যাচ্ছেন। আবার মেহবুব শেখের মতো কেউ কেউ পুরনো কর্মস্থলেও ফিরছেন।”

এদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, যারা অন্যান্য রাজ্য থেকে ফিরে আসছেন, তাদের জীবিকার জন্য রাজ্য সরকার একটি পরিকল্পনা নিয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

Categories

চাপের মুখে ঘর ছাড়ছেন গুরুগ্রামের মুসলিম শ্রমিকরা, আতঙ্কে ঘরবন্দি অনেকেই

আপডেট সময় : ০১:০২:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই ২০২৫

 

গুরুগ্রাম থেকে বাংলাদেশি সন্দেহে আটক হওয়ার ভয়ে ফিরে যাচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের বহু মুসলিম শ্রমিক। কেউ কেউ সাতদিন আটক থাকার পর ছাড়া পেলেও এখনও ঘর থেকে বেরোতে ভয় পাচ্ছেন, আবার কেউ ট্রেনের টিকিটের অপেক্ষায়, যেদিন পাবেন সেদিনই রওনা হবেন বলে জানাচ্ছেন।

অনেকে ট্রেনের টিকিটের জন্য অপেক্ষা না করে নিজেরাই বাস ভাড়া করে পাড়ি জমিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের দিকে। জনপ্রতি প্রায় আড়াই হাজার টাকা করে খরচ পড়ছে। তবে একাংশের দুশ্চিন্তা—দেশে ফিরে গেলে বয়স্ক বাবা-মা আর ছোট সন্তানদের কী খাওয়াবেন?

এইসব মানুষ মূলত কর্মসূত্রে দিল্লি সংলগ্ন গুরুগ্রামে থাকেন। তাদের মধ্যে অনেকেই সম্প্রতি পুলিশি অভিযানে আটক হয়েছিলেন ‌‌‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে।

স্থানীয় শ্রমিক সংগঠক মুকুল শেখ বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের বহু মানুষ এখান থেকে ফিরে গেছেন। যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে পুলিশ আবার যদি ধরে নিয়ে যায়, এই আশঙ্কায় সবাই আতঙ্কে রয়েছে।”

গত কয়েক মাসে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবৈধ ‘বাংলাদেশি’ শনাক্ত করতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষীদেরও আটক করা হচ্ছে। এদের পরিচয় যাচাই করতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কাছে পাঠানো হচ্ছে তথ্য। এমন ঘটনাও সামনে এসেছে যেখানে প্রকৃত ভারতীয় হয়েও কাউকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ভয়ে ঘরছাড়া হচ্ছেন না অনেকে

মালদা জেলার চাঁচোলের বাসিন্দা আনিসুর রহমান স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে গুরুগ্রামে থাকেন প্রায় আট বছর। তিনি গাড়ি ধোয়ার কাজ করেন, স্ত্রী গৃহকর্মী, ছেলে ছোটখাটো কাজে যুক্ত। কয়েক সপ্তাহ আগে তাকেও ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক করে পুলিশ।

“চাঁচোল থানা থেকে আমার পরিচয় যাচাই করে আনার পরে আমাকে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু সাতদিন ধরে কমিউনিটি সেন্টারে আটকে রেখেছিল। আধার কার্ডসহ সব পরিচয় দেখিয়েছিলাম, কিন্তু কিছুই শোনেনি। এখন কোনো কাগজও দেয়নি—যে আমার পরিচয় যাচাই হয়ে গেছে। এই অবস্থায় আবার যদি ধরে নিয়ে যায়, সেই ভয়ে আমি সাতদিন ধরে ঘর থেকেই বের হইনি,” বলেন আনিসুর।

তিনি আরও বলেন, “২ আগস্টের ট্রেনের টিকিট কেটে রেখেছি। যেদিন টিকিট সেইদিনই চলে যাব। মাসে ৭০ হাজার টাকা রোজগার করতাম আমরা তিনজন মিলে। কিছু ধারও আছে। এখন বাড়ি ফিরে কীভাবে সংসার চালাব জানি না। তবে এখানে আর থাকা যাবে না।”

তার সঙ্গেই আটক হওয়া আরও চারজন ইতিমধ্যেই ফিরে গেছেন বলে জানান তিনি।

“এখানে এসেই ফেঁসে গেলাম”

আরেক শ্রমিক, মালদার বাসিন্দা মুকুল হোসেন বছরখানেক আগে গুরুগ্রামে এসেছিলেন রাজমিস্ত্রির কাজ করতে। তাকেও আনিসুরের সঙ্গেই পুলিশ ধরেছিল।

তিনি বলেন, “আমার সব কাগজপত্র ছিল, তাও আটকে রেখেছিল। এখন আর সাহস হচ্ছে না এখানে থাকতে। দিল্লি থেকে ট্রেনে চড়ে ফিরে যাচ্ছি।”

ট্রেনের টিকিট না পেয়ে অনেকেই বাস ভাড়া করে পশ্চিমবঙ্গে ফিরছেন। রোজই গুরুগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে একাধিক বাস ছাড়ছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুপান্থ সিনহা জানান, তিনি দু’বার গুরুগ্রামের বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় গেছেন। “অনেক ঘর ফাঁকা দেখেছি। মানুষজন ভয়ে কথা বলতে পারছেন না। খুব আতঙ্কের পরিবেশ।”

শ্রমিক সংগঠক মুকুল শেখ জানান, যারা ফিরে গেছেন তাদের বেশিরভাগই মুসলমান, হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা অনেকেই এখনও রয়েছেন।

দেশে ফিরে কী খাব?

ফুড ডেলিভারি অ্যাপে কাজ করতেন নূর আলম। গুরুগ্রাম পুলিশ তাকে ছয়দিন আটকে রেখেছিল বাংলাদেশি সন্দেহে। পরিচয় যাচাইয়ের পর ছাড়া পেয়েছেন।

তিনি বলেন, “এখানে যা পরিস্থিতি, দেশে ফিরতেই হবে। কিন্তু ফিরে গিয়ে সংসার চালাব কীভাবে? দেশে মা-বাবা আর ছোট সন্তান আছে। ওদের মুখে খাবার দেব কীভাবে?”

নূর আলম জানান, তার আরও ১০টি পরিচিত পরিবার এখনো টিকিটের জন্য অপেক্ষায়। তিনি নিজে ফিরে গিয়ে হয়তো ব্যবসা শুরু করতে পারেন বলেও ভাবছেন।

পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক আসিফ ফারুক বলেন, “যারা অন্য রাজ্যে আটক হয়েছিলেন, তাদের অনেকেই এখন ফিরে যাচ্ছেন। আবার মেহবুব শেখের মতো কেউ কেউ পুরনো কর্মস্থলেও ফিরছেন।”

এদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, যারা অন্যান্য রাজ্য থেকে ফিরে আসছেন, তাদের জীবিকার জন্য রাজ্য সরকার একটি পরিকল্পনা নিয়েছে।