সংবাদ শিরোনাম ::
শাওয়াল মাসের ছয় রোযার গুরুত্ব ও ফজিলত পবিত্র ঈদে অবাধ মেলামেশা: এক ভয়াবহ সামাজিক সংকট থার্টি ফার্স্ট নাইট : আত্মসমালোচনার বদলে আত্মবিস্মৃতি জুড়ী উপজেলা শাখায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নতুন কমিটি গঠিত ফ্যাশন-বিকৃতি, লিঙ্গ-পরিচয় ও মানসিক বিপর্যয় ইসলামের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবু বকর (রা): একটি নির্মোহ মূল্যায়ন ২২ বছর পর ভারতকে হারিয়ে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ৩ ধাপ এগোলো বাংলাদেশ মাদ্রাসায় নারী শিক্ষা বিস্তারের আহ্বান ধর্ম উপদেষ্টার দাওয়াতি কাজে মনোযোগ দিতে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত আজহারীর ময়লার ভাগাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে সাদ্দামের সাক্ষাৎকার, যোগ্য ব্যক্তি যোগ্য জায়গায়

রাবা গণহত্যা, মিশরের রক্তে লেখা এক অভিশপ্ত অধ্যায়

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান, কন্ট্রিবিউটিং রিপোর্টার, মিশর:
  • আপডেট সময় : ০২:৫১:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৫ ১৯৫ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট—তারিখটি হয়তো ক্যালেন্ডারে নিছক আরেকটি দিন, কিন্তু মিশরের ইতিহাসে এটি খোদাই হয়ে আছে কালো অক্ষরে। কায়রোর রাবা আল-আদাওয়িয়া স্কয়ার সেদিন ভোরে ছিল মানুষের ভিড়ে, উজ্জ্বল প্রত্যাশায় আর শান্তিপূর্ণ দাবির মিছিলে পূর্ণ। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোর্সির পদচ্যুতির পর টানা ছয় সপ্তাহ ধরে সেখানে অবস্থান করছিলেন তাঁর সমর্থকরা। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, এই গণপ্রতিবাদ হয়তো আবার ফিরিয়ে আনবে ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার, ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। কিন্তু সূর্য ওঠার পর অল্প সময়েই শান্তির পতাকা রঞ্জিত হয়ে গেল রক্তে, আর স্কয়ার পরিণত হলো মৃত্যুপুরীতে।

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী, সাঁজোয়া যান, ভারী অস্ত্র, এবং স্নাইপারদের নিয়ে চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে মুহূর্তের মধ্যে গুলি চালাতে শুরু করল নিরস্ত্র মানুষের ওপর। সেই সকালের বাতাস কাঁপছিল ক্রন্দনে, আহতের আর্তনাদে, আর ভয়ের সেই শীতল স্রোতে যা প্রতিটি বুক কাঁপিয়ে তুলছিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার হিসাবে, শুধু রাবা স্কয়ারেই কমপক্ষে ৮১৭ জন নিহত হন, বহু প্রত্যক্ষদর্শী বলছেন, সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। কাছাকাছি নিজাতাহ স্কয়ারেও একই রকম হত্যাযজ্ঞ চলছিল, লাশের সারি আর রক্তে ভিজে যাওয়া রাস্তাগুলো হয়ে উঠেছিল নীরব সাক্ষী।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই ঘটনাকে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা আখ্যা দিয়ে বলেছে, এটি ছিল পরিকল্পিত, সুসংগঠিত এবং রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হত্যাযজ্ঞ—যা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শামিল। কিন্তু এই নৃশংসতার এক দশক পেরিয়ে গেলেও কোনো বিচার হয়নি, দায়ীদের একজনও আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ায়নি। বরং রাবার সেই দিন যেন বৈধতা দিয়েছে রাষ্ট্রীয় দমননীতিকে, তৈরি করেছে ভয় ও নীরবতার সংস্কৃতি।

রাবা গণহত্যা মিশরের জন্য কেবল একটি দিনের স্মৃতি নয়—এটি এক প্রজন্মের মনে খোদাই হয়ে যাওয়া ভয়, ক্ষোভ ও অবিচারের প্রতীক। এর পরবর্তী বছরগুলোতে দেশজুড়ে শুরু হয় ভয়াবহ দমনপীড়ন—গণগ্রেপ্তার, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন, এবং সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ। আমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই দশ বছরকে আখ্যা দিয়েছে “অপরাধহীনতার দশ”—যেখানে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে জেল, গুম, অথবা মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া।

আজও রাবার রক্তমাখা সকাল মিশরের রাস্তাঘাটে অদৃশ্য ছায়ার মতো ভেসে বেড়ায়। যাদের প্রিয়জন হারিয়ে গেছে, তারা এখনও অপেক্ষা করছেন ন্যায়বিচারের জন্য—যদিও জানেন, এই অপেক্ষা দীর্ঘ, কণ্টকাকীর্ণ, এবং হয়তো প্রজন্ম পেরিয়েও শেষ হবে না। রক্তে রঞ্জিত সেই দিনের স্মৃতি এখন ইতিহাসের অমোচনীয় দাগ, যা মনে করিয়ে দেয়—যখন রাষ্ট্র নিজ জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন তা কেবল হত্যাযজ্ঞই নয়, মানবতার প্রতি এক স্থায়ী বিশ্বাসঘাতকতা হয়ে ওঠে।

 

লেখক ও কলামিস্ট, শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

Categories

রাবা গণহত্যা, মিশরের রক্তে লেখা এক অভিশপ্ত অধ্যায়

আপডেট সময় : ০২:৫১:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৫

 

২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট—তারিখটি হয়তো ক্যালেন্ডারে নিছক আরেকটি দিন, কিন্তু মিশরের ইতিহাসে এটি খোদাই হয়ে আছে কালো অক্ষরে। কায়রোর রাবা আল-আদাওয়িয়া স্কয়ার সেদিন ভোরে ছিল মানুষের ভিড়ে, উজ্জ্বল প্রত্যাশায় আর শান্তিপূর্ণ দাবির মিছিলে পূর্ণ। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোর্সির পদচ্যুতির পর টানা ছয় সপ্তাহ ধরে সেখানে অবস্থান করছিলেন তাঁর সমর্থকরা। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, এই গণপ্রতিবাদ হয়তো আবার ফিরিয়ে আনবে ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার, ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। কিন্তু সূর্য ওঠার পর অল্প সময়েই শান্তির পতাকা রঞ্জিত হয়ে গেল রক্তে, আর স্কয়ার পরিণত হলো মৃত্যুপুরীতে।

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী, সাঁজোয়া যান, ভারী অস্ত্র, এবং স্নাইপারদের নিয়ে চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে মুহূর্তের মধ্যে গুলি চালাতে শুরু করল নিরস্ত্র মানুষের ওপর। সেই সকালের বাতাস কাঁপছিল ক্রন্দনে, আহতের আর্তনাদে, আর ভয়ের সেই শীতল স্রোতে যা প্রতিটি বুক কাঁপিয়ে তুলছিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার হিসাবে, শুধু রাবা স্কয়ারেই কমপক্ষে ৮১৭ জন নিহত হন, বহু প্রত্যক্ষদর্শী বলছেন, সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। কাছাকাছি নিজাতাহ স্কয়ারেও একই রকম হত্যাযজ্ঞ চলছিল, লাশের সারি আর রক্তে ভিজে যাওয়া রাস্তাগুলো হয়ে উঠেছিল নীরব সাক্ষী।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই ঘটনাকে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা আখ্যা দিয়ে বলেছে, এটি ছিল পরিকল্পিত, সুসংগঠিত এবং রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হত্যাযজ্ঞ—যা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শামিল। কিন্তু এই নৃশংসতার এক দশক পেরিয়ে গেলেও কোনো বিচার হয়নি, দায়ীদের একজনও আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ায়নি। বরং রাবার সেই দিন যেন বৈধতা দিয়েছে রাষ্ট্রীয় দমননীতিকে, তৈরি করেছে ভয় ও নীরবতার সংস্কৃতি।

রাবা গণহত্যা মিশরের জন্য কেবল একটি দিনের স্মৃতি নয়—এটি এক প্রজন্মের মনে খোদাই হয়ে যাওয়া ভয়, ক্ষোভ ও অবিচারের প্রতীক। এর পরবর্তী বছরগুলোতে দেশজুড়ে শুরু হয় ভয়াবহ দমনপীড়ন—গণগ্রেপ্তার, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন, এবং সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ। আমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই দশ বছরকে আখ্যা দিয়েছে “অপরাধহীনতার দশ”—যেখানে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে জেল, গুম, অথবা মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া।

আজও রাবার রক্তমাখা সকাল মিশরের রাস্তাঘাটে অদৃশ্য ছায়ার মতো ভেসে বেড়ায়। যাদের প্রিয়জন হারিয়ে গেছে, তারা এখনও অপেক্ষা করছেন ন্যায়বিচারের জন্য—যদিও জানেন, এই অপেক্ষা দীর্ঘ, কণ্টকাকীর্ণ, এবং হয়তো প্রজন্ম পেরিয়েও শেষ হবে না। রক্তে রঞ্জিত সেই দিনের স্মৃতি এখন ইতিহাসের অমোচনীয় দাগ, যা মনে করিয়ে দেয়—যখন রাষ্ট্র নিজ জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন তা কেবল হত্যাযজ্ঞই নয়, মানবতার প্রতি এক স্থায়ী বিশ্বাসঘাতকতা হয়ে ওঠে।

 

লেখক ও কলামিস্ট, শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর।