ফ্যাশন-বিকৃতি, লিঙ্গ-পরিচয় ও মানসিক বিপর্যয়
- আপডেট সময় : ১১:১৩:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫ ৪২ বার পড়া হয়েছে

উনিশ শতকে ম্যাক্সিম হার্শফেল্ড যে মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতির কথা উল্লেখ করেছিলেন, আধুনিক সমাজে তা আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাঁর গবেষণা দেখায়, কিছু পুরুষ নারীর পোশাক, অলঙ্কার ও সৌন্দর্যসামগ্রীর প্রতি এমন এক অস্বাভাবিক আকর্ষণ অনুভব করে, যা ধীরে ধীরে তাদের মানসিক গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। প্রথমদিকে এই প্রবণতা কেবল বাহ্যিক অনুকরণে সীমাবদ্ধ থাকে—সাজগোজে উৎসাহ, কোমল ভঙ্গিমা, অলঙ্কারের প্রতি টান, কিংবা নারীর মতো আচরণে ক্ষণিক আনন্দ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অভ্যাস রূপ নেয় মনের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতায়, যেখানে ব্যক্তি নিজের লিঙ্গ-পরিচয় সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়ে এবং বিপরীত লিঙ্গের প্রতিচ্ছবিকে আত্মপরিচয়ের নিরাপদ আশ্রয় বলে ভাবতে থাকে। মনোবিজ্ঞানীরা এই অবস্থাকে একধরনের পরিচয়-সংকট হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যা আত্মবিশ্বাসের অভাব, আবেগিক দুর্বলতা, সামাজিক দায়িত্ববোধের ক্ষয় এবং মানসিক অসামঞ্জস্যের জন্ম দেয়।
ফ্যাশন-সংস্কৃতির অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার এই সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। আধুনিক ভোগবাদ পোশাকের লিঙ্গ-সীমানাকে ক্রমে অস্পষ্ট করে তুলেছে; নারীর অলঙ্কার, রঙ, বস্ত্র ও সাজসজ্জা যখন পুরুষের ব্যবহার্য পণ্যের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, তখন মনোজগতে জন্ম নেয় বিভ্রান্তির বীজ। এই অবস্থাকে কিছু গবেষক আকার-ইনফিল্ট্রেশন নামে উল্লেখ করেছেন—অর্থাৎ বিপরীত লিঙ্গের আচরণ, রুচি ও প্রতীকসমূহ ধীরে ধীরে ব্যক্তির মানসিক পরিসরে প্রবেশ করে, এবং একসময় সেটিই তার আত্ম-উপলব্ধির অংশ হয়ে ওঠে। এটি কেবল রুচির বিচ্যুতি নয়; বরং মনস্তত্ত্বের গভীরে লুকিয়ে থাকা লিঙ্গ-চরিত্রগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
ধর্মীয় ঐতিহ্যে যুগ যুগ ধরে পুরুষের জন্য রেশম, সোনা ও নারীর জন্য নির্ধারিত অলঙ্কার বর্জনের যে নির্দেশনা এসেছে, তার অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা এখানেই—মানুষের স্বভাবগত পরিচয়কে অটুট রাখা এবং লিঙ্গ-চরিত্রের স্বাভাবিক সীমানাকে রক্ষা করা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন রুচির বিকৃতি সমাজে বিস্তার লাভ করে, তখন ব্যক্তি প্রথমে নিজের পরিচয় নিয়ে দ্বিধায় পড়ে, পরে আচরণগত বিশৃঙ্খলা, নৈতিক দুর্বলতা এবং সামাজিক ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়।
অতএব, ফ্যাশনের নামে ছদ্ম-নন্দনতত্ত্বের এই প্রবাহ কেবল পোশাকের পরিবর্তন নয়—এ মানুষের মনোজগতের গভীরে সঞ্চারিত এক সংকটের আভাস। যেখানে বাহ্যিক সাজসজ্জার আড়ালে নীরবে জন্ম নেয় আত্ম-অবমূল্যায়ন, নষ্ট হয় স্বাভাবিক রুচি, এবং মানুষের অস্তিত্বে সৃষ্টি হয় এমন শূন্যতা, যা শেষ পর্যন্ত লিঙ্গ-পরিচয় ও চরিত্রগত স্থিতির উপরই আঘাত হানে।
● মুহাম্মদ আম্মার হোসাইন: শিক্ষার্থী, ইসলামি আইন বিভাগ, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়।
islamicbdnews.com/SUT













