সংবাদ শিরোনাম ::
শাওয়াল মাসের ছয় রোযার গুরুত্ব ও ফজিলত পবিত্র ঈদে অবাধ মেলামেশা: এক ভয়াবহ সামাজিক সংকট থার্টি ফার্স্ট নাইট : আত্মসমালোচনার বদলে আত্মবিস্মৃতি জুড়ী উপজেলা শাখায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নতুন কমিটি গঠিত ফ্যাশন-বিকৃতি, লিঙ্গ-পরিচয় ও মানসিক বিপর্যয় ইসলামের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবু বকর (রা): একটি নির্মোহ মূল্যায়ন ২২ বছর পর ভারতকে হারিয়ে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ৩ ধাপ এগোলো বাংলাদেশ মাদ্রাসায় নারী শিক্ষা বিস্তারের আহ্বান ধর্ম উপদেষ্টার দাওয়াতি কাজে মনোযোগ দিতে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত আজহারীর ময়লার ভাগাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে সাদ্দামের সাক্ষাৎকার, যোগ্য ব্যক্তি যোগ্য জায়গায়

মাজহাব কেন আবশ্যকীয়?

মুহাম্মদ আম্মার হোসাইন
  • আপডেট সময় : ০৮:৩৫:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ৫৬৪ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

মানবমস্তিষ্কের পরিধি সীমিত, অথচ শরীয়তের সমুদ্র অসীম গভীর। কুরআনের প্রতিটি আয়াত, সুন্নাহর প্রতিটি বাক্য, তাদের মাঝে নিহিত রহস্য, নাসিখ–মানসুখের সূক্ষ্মতা, সহীহ–দাঈফের পার্থক্য, খাস–আমের পরিধি, মুজমাল–মুবাইয়্যিনের ব্যাখ্যা—এসবের ভেতর সঠিক পথ খুঁজে নেওয়া প্রতিটি মানুষের সাধ্য নয়। এটি এমন এক অভিযাত্রা, যেন এক ক্ষুদ্র নৌকা নিয়ে মহাসমুদ্র পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা।

অতএব, আল্লাহ তা‘আলা উম্মতের কল্যাণে যুগে যুগে এমন মহাপুরুষ দান করেছেন—ইমামগণ। তাঁরা তাঁদের অশেষ মেধা, অপরিসীম ত্যাগ ও দীপ্ত ইজতিহাদের আলোকে শরীয়তের গুপ্ত রত্ন উদ্ঘাটন করেছেন। তাঁদের পরিশ্রমের ফলেই আজ কুরআন ও সুন্নাহর বিধানসমূহ সাধারণ মানুষের জন্য বোধগম্য ও সুসংগঠিত রূপে সংরক্ষিত। ইমামগণ সেই দিশারী, যাঁদের হাত ধরে শরীয়তের অনন্ত সাগরে উম্মত নিরাপদে চলেছে, বিভ্রান্তির অন্ধকারে আলো খুঁজে পেয়েছে।

মাজহাব অনুসরণ করা মানে কুরআন–সুন্নাহ থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়; বরং কুরআন–সুন্নাহর ব্যাখ্যার আলোকিত ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করা। যেমন এক অজ্ঞাত যাত্রী গভীর জঙ্গলে পথ হারালে অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শকের হাত ধরে অগ্রসর হয়, তেমনি সাধারণ মুসলিম ইমামদের ব্যাখ্যা ও মুজতাহিদ আলিমদের ইজতিহাদের উপর নির্ভর করে চলতে বাধ্য।

আল্লাহ তায়ালার বাণী – আলেমদের অনুসরণ করার নির্দেশ: “তোমরা যদি না জান, তবে জ্ঞানীদের নিকট জিজ্ঞাসা কর।” (সূরা আন-নাহল: ৪৩)

এখানে সাধারণ মানুষ নিজে থেকে শরীয়তের গভীর বিষয় বুঝবে না; বরং আলেমদের অনুসরণ করবে। এটাই মাজহাব অনুসরণের মৌলিক ভিত্তি।

আবার ঐক্য ও পথপ্রদর্শকের ব্যাপারেও আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি হেদায়াত স্পষ্ট হওয়ার পর রাসূলের বিরোধিতা করে এবং মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে সেই পথেই ছেড়ে দেব এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।” (সূরা আন-নিসা: ১১৫)

এখানে মুমিনদের পথ বলতে সাহাবা ও ইমামদের ইজতিহাদের পথও অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, উম্মাহর পথকে আঁকড়ে ধরা—এটাই মাজহাব।

মু‘আয ইবনে জাবল (রা.)–এর হাদিস স্পষ্ট করে—ইজতিহাদ অনুমোদিত। ইয়ামানে পাঠানোর সময় রাসূল (সা.) তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন—

“কিসে ফয়সালা করবে?”

তিনি বললেন: “আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী।”

“যদি না পাও?”—“রাসূলের সুন্নাহ অনুযায়ী।”

“যদি সেখানেও না পাও?”—“তাহলে ইজতিহাদ করব।”

এতে সন্তুষ্ট হয়ে রাসূল (সা.) বললেন: “সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি রাসূলের দূতকে এমন তাওফিক দিলেন যা রাসূলকে সন্তুষ্ট করে।” (আবু দাউদ, তিরমিযী)

যদি আমরা মাজহাবের বাতিঘর অগ্রাহ্য করি, তবে সাধারণ মানুষ অনির্দিষ্টতার অন্ধকারে হারাবে, বিভ্রান্তির ঝঞ্ঝার তীরে থমথমে হয়ে উঠবে, বিশেষত আমাদের আমল—যে প্রতিটি পদক্ষেপ কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রমাণিত। প্রতিটি আমলই আল্লাহর হুকুমের সাক্ষ্য বহন করে, তবে কোন আমল থেকে কোনটি গ্রহণযোগ্য হবে, কোনটি নিবিড় প্রয়োগের দাবি রাখে, তা ব্যক্তিগত বিচারে নির্ধারণ করা দুঃসাধ্য।

সময় ও পরিস্থিতির বিচিত্র ঢেউয়ে যদি একেকটি আমল স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করা হয়, তবে জায়েজ ও হারামের সংমিশ্রণে সত্যিকারভাবে কোনটিই স্থায়ী গ্রহণযোগ্যতায় স্থির থাকবে না। এ কারণেই ইসলামী শরীয়তে মাজহাবের নির্দিষ্টতা অগ্রাহ্য করার উপায় নেই; এটি যেমন পথপ্রদর্শক, তেমনি আমলের স্থায়ীত্ব ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।

ইসলামী জীবনাচারে প্রতিটি আমল আল্লাহর হুকুমের প্রতিফলন, তবে আমাদের সীমিত বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতায় এগুলোর সঠিক প্রয়োগ চিহ্নিত করা দুরূহ। নামাযের সূক্ষ্ম প্রহর, রুকু থেকে ওঠার পর হাত বাঁধা বা ফাতিহার পর “আমীন” উচ্চারণের জোর—হানাফি ও শাফেয়ী মাজহাবের মধ্যে ভিন্ন; যাকাতের হিসাব, ব্যবসায়িক আয় বা ভাড়ার প্রাপ্তিতে মাসিক অঙ্ক নির্ধারণ—ইমামগণের ইজতিহাদে ভিন্নতা; রোযা ভুলে ভাঙলে নয়, তবে কাফফারা ও ইচ্ছাকৃত ভঙ্গের প্রক্রিয়া মাজহাবভেদে ভিন্ন; তালাকের গণনা—এক বসায় তিনবার বলা হলে হানাফিতে তিন তালাক, কিছু হাম্বলি ও ইবনে তাইমিয়াতে এক তালাক।

এই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মাজহাব শুধু বিধি নয়, এটি আমল ও মানসিক স্থিরতার দিকদর্শক, যা বিভ্রান্তি ও দ্বন্দ্বের অন্ধকার থেকে মানবকে আলোকিত করে। মাজহাবের নির্দিষ্টতা মানা মানে কেবল শৃঙ্খলা নয়, বরং আত্মার শান্তি, আমলের স্থায়ীত্ব এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতি দায়বদ্ধতার প্রকাশ।

রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন, কিন্তু তাঁর আমল কখনও এক নকশা অনুসরণ করেননি; বরং আল্লাহর ইচ্ছা ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী প্রতিটি সময়ে পৃথক পৃথক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এক ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয় রাসূলের সমস্ত আমল, প্রত্যেক ক্ষুদ্রতম নিদর্শন, প্রত্যেক সুন্নাহর ছায়া অনুসরণ করা।

তবে মাজহাবের ক্ষেত্রে বিষয়টি অন্য রকম। আজ, সারা বিশ্বে মুসলিম উম্মতকে কেন্দ্র করে যা ধারা তৈরি হয়েছে, তা হলো—রাসূলুল্লাহ (সা.)–এর সমস্ত আমল ও সুন্নাহ এক অব্যাহত নৈঃশব্দিক প্রবাহে বয়ে চলেছে। কুরআন ও সুন্নাহর প্রতিটি বিধান, প্রতিটি সূক্ষ্ম দিক, এমনকি এক মুহূর্তের জন্যও বাদ যায়নি; বরং ইমামগণ, আলিমগণ ও মুজতাহিদদের মেধা ও পরিশ্রমের আলোকিত রেশে তা প্রতিটি যুগে ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষিত।

তাই আমরা বলতে পারি, মাজহাবের বিদ্যমানতা শুধুই ব্যক্তি নির্ভরতার বিষয় নয়; এটি উম্মতের ঐক্যের প্রাচীর। ইতিহাস প্রমাণ করে, যেখানে মাজহাবহীনতার প্রচার হয়েছে, সেখানে দ্বীনের নামে বিভাজন, স্বেচ্ছাচারিতা ও অনৈতিক বিরোধের বিস্তার ঘটেছে।

পরিশেষে, মাজহাব হলো আলেমদের সংগ্রহীত জ্ঞান, যা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে উম্মতকে পথপ্রদর্শন করে, বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করে এবং উম্মতের ঐক্যকে অটুট রাখে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামি আইন বিভাগ, আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়।

এসইউটি/

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

Categories

মাজহাব কেন আবশ্যকীয়?

আপডেট সময় : ০৮:৩৫:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫

 

মানবমস্তিষ্কের পরিধি সীমিত, অথচ শরীয়তের সমুদ্র অসীম গভীর। কুরআনের প্রতিটি আয়াত, সুন্নাহর প্রতিটি বাক্য, তাদের মাঝে নিহিত রহস্য, নাসিখ–মানসুখের সূক্ষ্মতা, সহীহ–দাঈফের পার্থক্য, খাস–আমের পরিধি, মুজমাল–মুবাইয়্যিনের ব্যাখ্যা—এসবের ভেতর সঠিক পথ খুঁজে নেওয়া প্রতিটি মানুষের সাধ্য নয়। এটি এমন এক অভিযাত্রা, যেন এক ক্ষুদ্র নৌকা নিয়ে মহাসমুদ্র পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা।

অতএব, আল্লাহ তা‘আলা উম্মতের কল্যাণে যুগে যুগে এমন মহাপুরুষ দান করেছেন—ইমামগণ। তাঁরা তাঁদের অশেষ মেধা, অপরিসীম ত্যাগ ও দীপ্ত ইজতিহাদের আলোকে শরীয়তের গুপ্ত রত্ন উদ্ঘাটন করেছেন। তাঁদের পরিশ্রমের ফলেই আজ কুরআন ও সুন্নাহর বিধানসমূহ সাধারণ মানুষের জন্য বোধগম্য ও সুসংগঠিত রূপে সংরক্ষিত। ইমামগণ সেই দিশারী, যাঁদের হাত ধরে শরীয়তের অনন্ত সাগরে উম্মত নিরাপদে চলেছে, বিভ্রান্তির অন্ধকারে আলো খুঁজে পেয়েছে।

মাজহাব অনুসরণ করা মানে কুরআন–সুন্নাহ থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়; বরং কুরআন–সুন্নাহর ব্যাখ্যার আলোকিত ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করা। যেমন এক অজ্ঞাত যাত্রী গভীর জঙ্গলে পথ হারালে অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শকের হাত ধরে অগ্রসর হয়, তেমনি সাধারণ মুসলিম ইমামদের ব্যাখ্যা ও মুজতাহিদ আলিমদের ইজতিহাদের উপর নির্ভর করে চলতে বাধ্য।

আল্লাহ তায়ালার বাণী – আলেমদের অনুসরণ করার নির্দেশ: “তোমরা যদি না জান, তবে জ্ঞানীদের নিকট জিজ্ঞাসা কর।” (সূরা আন-নাহল: ৪৩)

এখানে সাধারণ মানুষ নিজে থেকে শরীয়তের গভীর বিষয় বুঝবে না; বরং আলেমদের অনুসরণ করবে। এটাই মাজহাব অনুসরণের মৌলিক ভিত্তি।

আবার ঐক্য ও পথপ্রদর্শকের ব্যাপারেও আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি হেদায়াত স্পষ্ট হওয়ার পর রাসূলের বিরোধিতা করে এবং মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে সেই পথেই ছেড়ে দেব এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।” (সূরা আন-নিসা: ১১৫)

এখানে মুমিনদের পথ বলতে সাহাবা ও ইমামদের ইজতিহাদের পথও অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, উম্মাহর পথকে আঁকড়ে ধরা—এটাই মাজহাব।

মু‘আয ইবনে জাবল (রা.)–এর হাদিস স্পষ্ট করে—ইজতিহাদ অনুমোদিত। ইয়ামানে পাঠানোর সময় রাসূল (সা.) তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন—

“কিসে ফয়সালা করবে?”

তিনি বললেন: “আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী।”

“যদি না পাও?”—“রাসূলের সুন্নাহ অনুযায়ী।”

“যদি সেখানেও না পাও?”—“তাহলে ইজতিহাদ করব।”

এতে সন্তুষ্ট হয়ে রাসূল (সা.) বললেন: “সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি রাসূলের দূতকে এমন তাওফিক দিলেন যা রাসূলকে সন্তুষ্ট করে।” (আবু দাউদ, তিরমিযী)

যদি আমরা মাজহাবের বাতিঘর অগ্রাহ্য করি, তবে সাধারণ মানুষ অনির্দিষ্টতার অন্ধকারে হারাবে, বিভ্রান্তির ঝঞ্ঝার তীরে থমথমে হয়ে উঠবে, বিশেষত আমাদের আমল—যে প্রতিটি পদক্ষেপ কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রমাণিত। প্রতিটি আমলই আল্লাহর হুকুমের সাক্ষ্য বহন করে, তবে কোন আমল থেকে কোনটি গ্রহণযোগ্য হবে, কোনটি নিবিড় প্রয়োগের দাবি রাখে, তা ব্যক্তিগত বিচারে নির্ধারণ করা দুঃসাধ্য।

সময় ও পরিস্থিতির বিচিত্র ঢেউয়ে যদি একেকটি আমল স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করা হয়, তবে জায়েজ ও হারামের সংমিশ্রণে সত্যিকারভাবে কোনটিই স্থায়ী গ্রহণযোগ্যতায় স্থির থাকবে না। এ কারণেই ইসলামী শরীয়তে মাজহাবের নির্দিষ্টতা অগ্রাহ্য করার উপায় নেই; এটি যেমন পথপ্রদর্শক, তেমনি আমলের স্থায়ীত্ব ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।

ইসলামী জীবনাচারে প্রতিটি আমল আল্লাহর হুকুমের প্রতিফলন, তবে আমাদের সীমিত বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতায় এগুলোর সঠিক প্রয়োগ চিহ্নিত করা দুরূহ। নামাযের সূক্ষ্ম প্রহর, রুকু থেকে ওঠার পর হাত বাঁধা বা ফাতিহার পর “আমীন” উচ্চারণের জোর—হানাফি ও শাফেয়ী মাজহাবের মধ্যে ভিন্ন; যাকাতের হিসাব, ব্যবসায়িক আয় বা ভাড়ার প্রাপ্তিতে মাসিক অঙ্ক নির্ধারণ—ইমামগণের ইজতিহাদে ভিন্নতা; রোযা ভুলে ভাঙলে নয়, তবে কাফফারা ও ইচ্ছাকৃত ভঙ্গের প্রক্রিয়া মাজহাবভেদে ভিন্ন; তালাকের গণনা—এক বসায় তিনবার বলা হলে হানাফিতে তিন তালাক, কিছু হাম্বলি ও ইবনে তাইমিয়াতে এক তালাক।

এই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মাজহাব শুধু বিধি নয়, এটি আমল ও মানসিক স্থিরতার দিকদর্শক, যা বিভ্রান্তি ও দ্বন্দ্বের অন্ধকার থেকে মানবকে আলোকিত করে। মাজহাবের নির্দিষ্টতা মানা মানে কেবল শৃঙ্খলা নয়, বরং আত্মার শান্তি, আমলের স্থায়ীত্ব এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতি দায়বদ্ধতার প্রকাশ।

রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন, কিন্তু তাঁর আমল কখনও এক নকশা অনুসরণ করেননি; বরং আল্লাহর ইচ্ছা ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী প্রতিটি সময়ে পৃথক পৃথক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এক ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয় রাসূলের সমস্ত আমল, প্রত্যেক ক্ষুদ্রতম নিদর্শন, প্রত্যেক সুন্নাহর ছায়া অনুসরণ করা।

তবে মাজহাবের ক্ষেত্রে বিষয়টি অন্য রকম। আজ, সারা বিশ্বে মুসলিম উম্মতকে কেন্দ্র করে যা ধারা তৈরি হয়েছে, তা হলো—রাসূলুল্লাহ (সা.)–এর সমস্ত আমল ও সুন্নাহ এক অব্যাহত নৈঃশব্দিক প্রবাহে বয়ে চলেছে। কুরআন ও সুন্নাহর প্রতিটি বিধান, প্রতিটি সূক্ষ্ম দিক, এমনকি এক মুহূর্তের জন্যও বাদ যায়নি; বরং ইমামগণ, আলিমগণ ও মুজতাহিদদের মেধা ও পরিশ্রমের আলোকিত রেশে তা প্রতিটি যুগে ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষিত।

তাই আমরা বলতে পারি, মাজহাবের বিদ্যমানতা শুধুই ব্যক্তি নির্ভরতার বিষয় নয়; এটি উম্মতের ঐক্যের প্রাচীর। ইতিহাস প্রমাণ করে, যেখানে মাজহাবহীনতার প্রচার হয়েছে, সেখানে দ্বীনের নামে বিভাজন, স্বেচ্ছাচারিতা ও অনৈতিক বিরোধের বিস্তার ঘটেছে।

পরিশেষে, মাজহাব হলো আলেমদের সংগ্রহীত জ্ঞান, যা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে উম্মতকে পথপ্রদর্শন করে, বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করে এবং উম্মতের ঐক্যকে অটুট রাখে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামি আইন বিভাগ, আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়।

এসইউটি/