বিবাহ এমন একটি মহান ইবাদত যার সূচনা আদি মানব হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আঃ)-এর মাধ্যমে হয়েছে এবং তা জান্নাতেও অব্যাহত থাকবে।
শরয়ী দৃষ্টিকোণে বিবাহ-শাদীতে নেই কোনো জটিলতা, দুঃখ-বেদনা, বাড়াবাড়ি কিংবা কোনো ধরণের গুনাহের সরঞ্জাম।
এই বিবাহে আছে শুধু বরকত ও রহমত, হামদর্দী ও কোমলতা, শান্তি আর শান্তি এবং গভীর ভালোবাসা।
কিন্তু আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো—এই সহজ একটি ইবাদত পালন করতে গিয়ে শরীয়ত কর্তৃক অননুমোদিত অনেক কাজ ও বিজাতীয় কালচার অবলম্বন করে কঠিন থেকে কঠিন করে সমাজে উপস্থাপিত করেই চলেছে। যা বর্তমানে সমাজ ধ্বংসের মারাত্মক ব্যাধি হিসেবে রূপ ধারণ করেছে। তার মধ্যে অন্যতম মারাত্মক ব্যাধি হলো “বৈরাত”।
এই বৈরাত হিন্দু সমাজ কর্তৃক উদ্ভাবিত।
যেমন ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া-তে উল্লেখ হয়েছে: হিন্দুদের বিবাহে যৌতুক বাধ্যতামূলক দিতে হত। আর তা কনে বিদায়ের সময়েই দেওয়া হত। সে সময় পথে চোর-ডাকাতের আক্রমণের আশঙ্কা থাকত বিধায় যৌতুকের মাল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরের সাথে অনেক লোক থাকত। হিন্দুদের সাথে সহাবস্থানের কারণে ধীরে ধীরে মুসলমানদের মধ্যেও এর অনুপ্রবেশ ঘটে। (ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া ১৩/১৯৯)।
বর্তমানে যেন বৈরাতি খানা-বিহীন বিবাহই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এটা শরয়ীভাবে যেমন বর্জনীয়, তেমনি একজন বিবেকবান ব্যক্তির কাছেও তিরস্কারযোগ্য অপরাধ। আর বৈরাতির আয়োজন মানেই গুনাহের আয়োজন।
যেমন হাকিমুল উম্মত আল্লামা শাহ আশরাফ আলী থানবী (রহঃ) বলেন: “এ আয়োজনে অন্য কোনো মন্দ দিক থাকুক বা না থাকুক এটা অবশ্যই আছে যে, বরযাত্রীর সংখ্যা দাওয়াতি সংখ্যার চেয়ে বেশি হয়, ফলে মেয়ে পক্ষকে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়।” (ইসলামী শাদী :১৭১)
এ ধরণের মেহমানদের ব্যাপারে হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে:
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ دُعِيَ فَلَمْ يُجِبْ فَقَدْ عَصَى اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَمن دخل على غَيْرِ دَعْوَةٍ دَخَلَ سَارِقًا وَخَرَجَ مُغِيرًا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন: “যে ব্যক্তি দাওয়াত পেয়ে (ওযরবিহীন) প্রত্যাখ্যান করে, সে আল্লাহ ও রাসূলের অবাধ্যাচরণ করল। আর যে ব্যক্তি বিনা দাওয়াতে আসলো সে যেন চোর সেজে ঢুকেছে এবং লুণ্ঠনকারী হিসেবে বের হয়েছে।” (আবু দাঊদ : ৩৭৪১)
এর অর্থ এই নয় যে, নির্দিষ্ট সংখ্যায় এলে বৈরাতি খানা বৈধ হয়ে যাবে। কারণ যে খানা জুলুমের ভিত্তিতে হয় বা এক প্রকার জোরপূর্বক নাম ও খ্যাতি লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে হয় তা জায়েয হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
উক্ত কথা আরো সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। যেমন হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে:
وَعَن أبي حرَّة الرقاشِي عَن عَمه قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «أَلا تَظْلِمُوا أَلَا لَا يَحِلُّ مَالُ امْرِئٍ إِلَّا بِطِيبِ نَفْسٍ مِنْهُ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الإيمان
আবূ হুররাহ আর্ রক্কাশী (রহঃ) তাঁর চাচা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “সাবধান! কারো ওপর জুলুম করবে না। সাবধান! কারো সম্পদ তার সন্তুষ্টি ছাড়া কারো জন্য হালাল নয়।” (বায়হাক্বী-শু’আবুল ঈমান: ৫১০৫, মুসনাদে আহমদ: ২০৬৯৫)
উল্লেখ্য: কনে পক্ষের মুখের কৃত্রিম হাসি সন্তুষ্টির পরিচয় বহন করে না। যদি করত, তাহলে ডাকাতদের ডাকাতি ও সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাসও বৈধ হয়ে যেত।
কেউ যদি প্রশ্ন করে—সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা কোনো প্রকার চাপ ছাড়া স্বেচ্ছায় করলে অসুবিধা কোথায়?
হ্যাঁ, যাদের কাছে বিবেক আছে তারা অসুবিধা অবশ্যই খুঁজে পাবে। যেমন:
১ | অবৈধ কাজ স্বেচ্ছায় করলে তা বৈধ হয়ে যায় না।
২ | ব্যক্তি বিশেষের জন্য অবৈধ কাজ বৈধতা পায় না।
৩ | সামর্থ্যবান ব্যক্তি যারা এই বৈরাতের আয়োজন করে থাকেন তারাও বাস্তব ক্ষেত্রে নিজেদের কলিজার টুকরা কন্যার ভবিষ্যত চিন্তা করে বরের পক্ষকে আমন্ত্রণ জানান।
কারণ—এই আয়োজন যদি না করেন তাহলে মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে ছোট হয়ে থাকতে হবে এবং বিভিন্ন ধরনের খোঁটা-তিরস্কার ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হবে। স্বেচ্ছায় এই আয়োজনকে বরণ করার পেছনে যদি আরো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়, তখন এর চেয়ে আরো ভয়াবহ কারণ বের হয়ে আসবে।
অতএব আসুন, আমরা মুসলমানরা বিবাহের মত মোবারক একটি ইবাদতকে বিজাতীয় কালচার মুক্ত রেখে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহজ-সাধ্য ও সর্বোত্তম পথ অনুসরণ করি।
আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে তাওফীক দান করুন। আমীন।
লেখক: দাওরায়ে হাদিস ও উচ্চতর ইসলামী আইন গবেষণাও ফাতাওয়া বিভাগ, জামিয়া মাদানিয়া শুলকবহর চট্টগ্রাম।